০১:৪৫ পূর্বাহ্ন, শুক্রবার, ১০ এপ্রিল ২০২৬, ২৬ চৈত্র ১৪৩২ বঙ্গাব্দ

মফস্বলে রাজধানীর কবি

  • Voice24 Admin
  • সময়ঃ ১২:০৪:১৬ অপরাহ্ন, বৃহস্পতিবার, ৯ এপ্রিল ২০২৬
  • ৫৪২ Time View

‘ঢাকা থেকে কবি যাচ্ছেন, একদিনের জন্য। তোর ওখানে উঠবেন। শহরটা ঘুরে দেখবেন। ব্যবস্থা করিস।’ এসএমএসটা পাঠিয়েছে সবুর। আমার বন্ধু। বাংলাদেশ ব্যাংকের বড় কর্মকর্তা। ব্যাংকের রিজার্ভ চুরি হওয়ার ঘটনায় মহাব্যস্ত এখন। যৌবনে আবৃত্তিশিল্পী হিসেবে নামডাক ছিল বেশ। কলেজজীবনে আমার লেখা কতগুলো কবিতা প্রশংসিত হয়েছে ওর কারণেই। 

রাজধানীর একজন কবি আমার বাড়ি আসছেন জেনে ভীষণ ভালোলাগা কাজ করছিল। এই শহরে জাতীয়পর্যায়ে পরিচিত এমন কোনো কবি নেই। আমরা যারা টুকটাক লিখি, নিজেরাই পড়ে, নিজেরাই হইচই করি। বহুবার রাজধানী থেকে খ্যাতনামা কোনো কবিকে দাওয়াত করে নিজেদের কবিতা শোনাবো বলে ভেবেছি। একবার আনাও হয়েছিল জেলা প্রশাসকের সহযোগিতায়; বছরদশেক আগের কথা। জেলা প্রশাসক মহোদয় নিজেও ছিলেন কবি। তিনি রাজধানীর এক কবিকে দাওয়াত করে আনলেন। পেশায় উচ্চপদস্থ আমলা। এসেছিলেন চুয়াডাঙ্গায় শ্যালকের জন্য মেয়ে দেখতে। সুযোগ বুঝে প্রশাসক মহোদয় তাঁর বাসায় কবিতাপাঠের আসর বসালেন। দাওয়াত পেলাম আমরা কয়েকজন কবি, লেখক ও সাংস্কৃতিককর্মী। 

তিনদিন ধরে বাছাই করলাম নিজের কবিতা। কোনটা কোনটা পড়া যায় কিছুতেই ঠিক করতে পারছিলাম না। বৌকে ডেকে শোনাব সে সাহস নেই। ব্লগার হত্যা ইস্যুতে প্রতিবাদী কবিতা লিখে গলা ফাটিয়ে পাঠ করেছি। উগ্র ধর্মীয় মৌলবাদীদের মোটেও ভয় পাইনি। জীবন একটাই, একবারই যাবে! আপোস করে লাভ কি? কিন্তু বউয়ের সামনে কথাটা বলতে পারলাম না বলে জীবনে কিছু হলো না। কবির সঙ্গে থাকতে থাকতে ওর ভেতর চরম কবিতা-বিদ্বেষ তৈরি হয়েছে। অথচ কলেজে ফার্স্ট ইয়ারে কবিতা দিয়েই পটিয়েছিলাম ওকে। সে কথা স্মরণ করে আমাদের দুজনেরই আফসোসের অন্ত নেই আজ। অগত্যা কাজের মেয়ে জরিমালাকে জোর করে বসিয়ে পঞ্চাশটা শুনিয়ে বিশটার একটা তালিকা তৈরি হলো। কেবল জোরে কাজ হলো না, পঞ্চাশ টাকার নোটও একটা ফেলতে হলো। 

সেবার রাতভোর চলল কবিতাপাঠের আসর। একের পর এক ক্লান্তিহীন স্বরচিত কবিতা পাঠ করে চললেন ডিসি সাহেব। সবচেয়ে বিরক্তির বিষয় হলো, দশ লাইনের কবিতার কখনো কখনো একঘণ্টার ব্যাখ্যা দিয়ে তিনি প্রতিষ্ঠা করেন কবিতাটি কেন মহান। নিজের বোধ-বুদ্ধি চাপিয়ে দেন কবিতার উপর, তা সে কবিতার ভেতর থাক আর না থাক।   

সমানে নিজের কবিতা পাঠ করলেন আগত কবিও। তিনিও তার কবিতার ব্যাখ্যা দিতে ভুুললেন না। পাশাপাশি তার কবিতাটির মতো আর কোনো কবিতা বাংলা সাহিত্যে লেখা হয়নি উল্লেখ করে কেন লেখা হয়নি তারও একটা জবাব তিনি দিয়ে গেলেন। ডিসি সাহেবের মেয়ে একটা ছড়া লিখেছিল কোনো একদিন, সেটিও শোনা হলো মেয়ের স্বকণ্ঠে। এর বাইরে আমরা গোটাদশেক কবি অপেক্ষা করে জীবন ও শিল্পের প্রতি সব ধরনের রুচি হারিয়ে চোখ ফোলাফোলা অবস্থা করে ভোরে বাড়ি ফিরলাম। ফেরার সময় ডিসি সাহেবের বিশেষ সহকারী আমাদের স্বাক্ষর নিয়ে একটি করে খাম ধরিয়ে দিলেন। বাসায় এসে দেখি চকচকা পাঁচশ টাকার একখানা নোট। কবিজীবনে প্রথম আয়, শেষ আয়ও হতে পারে, তবে সেটি হলো কবিতা কাগজে ছাপিয়ে বা পাঠ করে নয়, অন্যের কবিতা শুনে। আফসোসটা এখানেই। আমার ধর্মসঙ্গী চিলের মতো ছোঁ মেরে নোটটা নিয়ে নিলো, এই প্রথম খুশি হতে দেখলাম ওকে। 

‘একরাতে পাঁচশ টাকা? আমি গেলে কিন্তু পাঁচ হাজারের কমে ফিরতাম না!’ মশকরার ছলে বাঁশমারার শিল্পটা ওর ভালোমতোই জানা। পরে জেনেছি, ঐ আসর ঘিরে মোটা অঙ্কের বাজেট বের করেছিলেন ডিসি সাহেব। আমাদের স্বাক্ষরযুক্ত খাতায় পাঁচশ টাকার শেষে অতিরিক্ত একটা শূন্য যোগ করে সেই বাজেট জমা পড়েছিল সরকারি খাতায়। এরপর আর সেই ইতিহাসের পুনরাবৃত্তি ঘটেনি। ঘটেনি কারণ প্রমোশন পেয়ে অতি দ্রুতই সরে পড়লেন আমাদের কবি-প্রশাসক। এতে আমাদের মন খারাপ এবং ভালো দুটোই হলো।


এতদিন পর রাজধানী থেকে কবি আসছেন আমাদের এই মফস্বল শহরে। আমি আনন্দ-সংবাদটা সঙ্গে সঙ্গে ভাগাভাগি করলাম কবিবন্ধুদের সঙ্গে। ওরা সমান খুশি। এইবার আমাদের কবিতা রাজধানীমুখি হবে। রাজধানীর একজন স্বনামধন্য কবি আমাদের কবিতা শুনবেন। দুটো ভালোমন্দ বলবেন। এটা কম কিসের! 
‘কবির পুরা নাম কিরে মফেদুল?’ সফিক প্রশ্ন করেছিল।
‘আসলেই জানতে পারবি। আমরা কি আর দেশের সব কবি চিনি!’ জবাব দিলাম আমি। 
‘দেখিস, রাজধানীর কাক না আবার চলি আসে!’ বাঁকা হাসিটা টেনে বলেছিল হাবিবুল্লাহ। আমাদের অতি-উৎসাহে বালিমারা ওর বরাবরের অভ্যাস।
‘নিজে কবিতা লিখতে পারিসনি বুলি কবি আসার সংবাদে গা জ্বলচি তোর; না?’ ত্যাড়া উত্তর দেন কবি বাহার-ভাই।
‘গল্প লিকি। কবিতা লিকিনি বুলি খুটা দিতি পারো না বাহার-ভাই। এই শহরে কবি মেলা আছে। গল্পকার কেউ আছে তেমুন, দেকাও? এজন্যি অন্তত তুমাদের উচিত আমাকে সম্মান দেখানুর।’ পাল্টা জবাব দেয় হাবিবুল্লাহ।
‘আইচ্চা, দেকালাম!’ বলেই উঠে আর্মি স্টাইলে সালাম ঠোকে পাশে বসা আকবর মাস্টার। স্কুলে পড়া অবস্থায় টিউশনি করতে গিয়ে নামের শেষে মাস্টার পদবিটা কামিয়েছে। তারপর কয়েকবার হাই স্কুল ফেল করে মিষ্টির দোকান বসিয়েছে। কিন্তু নামটা সেই আকবর মাস্টারই থেকে গেল। 

আমরা ঠিক করলাম রাজধানীর কবির সঙ্গে আড্ডা ও কবিতাপাঠের আসরটা হবে শিল্পকলা একাডেমির নাট্যমঞ্চে। বহুদিন থেকে মঞ্চটা পড়ে আছে অনুষ্ঠানহীন। মাঝে একবার ইসলামি গানের প্রতিযোগিতা হয়েছিল। শেষ কবে নাটক হয়েছিল আমাদের খুব কষ্ট করে মনে করতে হবে এখন। শহরের কবিদের জানানো হলো। সকলে বেশ আগ্রহ নিয়ে নিজেদের কবিতা নির্বাচনে লেগে গেল। আমাদের বাড়িতে এখন কাজ করছে জিল্লুর মা। টাকা দিলে ও করে না হেন কাজ নেই। কিন্তু সমস্যা হলো অন্যখানে- একেবারে কানে শোনে না। বাড়ির পেছনে আছে এক কামারঘর। আজকাল কাজ তেমন জোটে না। ওকে গিয়ে ধরলাম। ত্রিশ টাকা, একঘণ্টা।


কবি এসে পৌঁছাবেন সন্ধ্যায় সিদ্ধান্ত হলো, পরদিন দুপুর পর্যন্ত শহরটা ঘুরিয়ে বিকেল সাড়ে পাঁচটায় বসবে কবিতার আসর। রাতের গাড়িতে আবার ফিরে যাবেন তিনি। আমি নিজে বাড়ির অতিথি কক্ষটা গোছালাম। বাথরুমের ওপরে বস্তাবন্দি করে রাখা বইগুলো নামাতে হলো। বেছে বেছে নামিদামী বইগুলো ঘরে সাজিয়ে রাখলাম। বিছানায় বালিশের কাছে রাখলাম ‘শেষের কবিতা’।

কবি এলেন সন্ধ্যা ছটায় জেআর পরিবহনে। একটা চামড়ার ব্যাগ হাতে। পরিপাটি পোশাক। দেখতেও বেশ হ্যান্ডসাম। রাজধানীর কবি বলে কথা! আমার দিকে এগিয়ে এসে হাতটা বাড়িয়ে দিয়ে বললেন, ‘যদি ভুল না করি, আপনি মফেদুল হাসান?’ 
‘কিন্তু বুঝলেন কিভাবে?’ হ্যাঁ সূচক মাথা নেড়ে উত্তর দিলাম আমি।
‘সবুর আপনার ডিটেইল বলে দিয়েছে। এতটা নির্ভুল বলতে পারবে ভাবিনি।’
‘আমার সম্পর্কে আর কিছু বলেনি সবুর?’ রিকশায় উঠে নিচুস্বরে জিজ্ঞাসা করলাম। 
‘আপনি একবার অঙ্ক পরীক্ষায় খাতা বদলে সবুরকে পাস করিয়ে দিয়েছিলেন। চুক্তি হয়েছিল বাংলাটা সবুর দেখে দেবে। কিন্তু সেদিন আপনাদের কক্ষে সবচেয়ে কড়া মাস্টারমশাইয়ের গার্ড পড়লো। আপনি বাংলায় ফেল করলেন।’ হাসতে হাসতে বললেন কবি। আমার ভেতর উচ্ছ্বাসের বেলুনটা ফুটো হয়ে গেল তৎক্ষণাৎ। সবুর আর বলার বিষয় পেলো না? এখন কোন মুখ নিয়ে বলি আমি কবি, কবিতা লিখে এলাকার সাংস্কৃতিক অঙ্গনে বেশ নামডাক হয়েছে। অগত্যা আলাপের লাগাম টেনে ধরতে হলো। 

‘বাহ! আপনার তো দেখছি পড়ার অভ্যাস আছে।’ ঘরে ঢুকে এদিক-সেদিক ছড়ানো ছিটানো কবিতার বইপত্র দেখে বললেন কবি। কোনো এক কারণে কিঞ্চিৎ বিরক্তও মনে হলো তাকে। 
‘তারপর আপনার লেখালেখি কেমন চলছে?’ রাতে খাবার টেবিলে জিজ্ঞেস করলাম আমি। আমি যে কবিতা লিখি সেটি সবুর বলে দিলে আলাপ জমাতে কি সুবিধাটাই না হতো! মনে মনে ভাবলাম আমি। 
‘ল্যাপটপ আর ট্যাবের যুগে কে আর হাতে লেখে বলুন? তাছাড়া টুকটাক প্রয়োজনে অফিসে কম্পোজিটর তো আছেই।’ বললেন কবি। 
‘সেই তো!’ যোগ করলাম আমি। ‘আমরা অবশ্য হাতেই লিখি। প্রয়োজন হলে দোকান থেকে কম্পোজ করিয়ে আনি।’ 
‘আচ্ছা।’ খেতে খেতে ছোট্ট করে বললেন তিনি। আমিও লিখি শুনে বিশেষ আগ্রহ তার চোখেমুখে দেখলাম না। 
‘খাওয়ার সময় লেখালেখির প্রসঙ্গ বাদ দাও তো!’ বৌয়ের মৃদু হিড়িকে আরো দমে যেতে হলো। সেই রাতে আলাপ বিশেষ এগুলো না। কিছু কবিতা রেখেছিলাম হাতের কাছে, ভেবেছিলাম খাওয়া শেষ করে পড়ে শোনাবো, সেটিও হলো না। 


‘নাস্তাটা সেরে শহরটা ঘুরে আসি?’ চায়ের ট্রে সামনে রেখে বললাম আমি।
‘এই পুচকে শহর আর কি দেখবো বলুন, শহরেই তো জীবনটা কাটলো।’ বললেন কবি।
‘তা যা বলেছেন। বাংলাদেশের সবচেয়ে ছোট জেলা এটা। তার ওপর আপনি এসেছেন রাজধানী থেকে। তবে সবুর লিখেছে আপনি শহরটা ঘুরবেন, তাই বললাম।’ 
‘ও ব্যাংকের কাজে ভীষণ ব্যস্ত, তাই ডিটেইল বলা হয়নি ওকে। আমাকে এখানকার মাঠে নিয়ে যাওয়ার একটু ব্যবস্থা করেন। রড-সিমেন্টের ভেতর বড় হওয়া; প্রকৃতির সঙ্গে কাটাই কিছুটা সময়; কি বলেন?’ বললেন কবি। 
‘তাই তো! প্রস্তাবটি আমার দিক থেকেই আসা উচিত ছিল। আপনি রাজধানীর মানুষ, এখানকার টিয়ে-সবুজ মেঘাচ্ছন্ন প্রকৃতি দেখলে মনটা ভরে উঠবে আপনার।’ কণ্ঠে উচ্ছ্বাস মেখে বলি আমি। ‘টিয়ে-সবুজ’? বাহ্, উপমাটা দারুণ হয়েছে তো! তবে ‘মেঘাচ্ছন্ন প্রকৃতি’ বলা ঠিক হলো বোধহয়। মনে মনে ভাবি আমি। 

নাস্তা শেষ করে আমরা ভৌরব টপকে নিশ্চিন্তপুরের মাঠে যাই। ‘দুপুরেই ফিরতে হবে। বিকেলে আবার আপনার আগমনে আমরা বন্ধুরা একটা সামান্য অনুষ্ঠানের আয়োজন করেছি।’ মাঠের আইল ধরে আগেপিছে হাঁটতে হাঁটতে বললাম আমি। 
‘দশটার গাড়িতে ফিরতি টিকিট বুকিং আছে। তার আগপর্যন্ত আছি আপনার সঙ্গে।’ বললেন কবি। আমরা হাঁটতে হাঁটতে অনেকটা ভিতরে চলে যাই।  
‘আচ্ছা, আপনাদের এখানে তো সব ধানী জমি?’ প্রশ্ন করেন কবি। 
‘জি। অন্যান্য ফসলও হয়।’ 
‘যেমন?’
‘বর্ষায় পাট। শীতে গম। আর এখন সবজি চাষ করছে অনেকে। কলার চাষও হচ্ছে কোথাও কোথাও। তবে চাষবাসের বিষয়ে আমার জ্ঞানবিশেষ নেই। আপনার বদৌলতে বহুদিন পর এদিকটায় আসা হলো।’  

‘আচ্ছা। কৃষকদের সঙ্গে একটু কথা বলা যায়, কি বলেন?’ বলেই কয়েকজন কৃষক নিড়ানি দিয়ে শূন্য জমিন চাষের জন্য প্রস্তুত করছিল সেদিকে হনহন করে চলে গেলেন কবি। আমি খানিকটা পিছনে পড়ে থাকলাম। রোদে তাপ ধরতে শুরু করেছে। একটা বাবলা গাছের মৃদুছায়ায় আশ্রয় নিতে হলো। আশেপাশের প্রায় সব কৃষকের সঙ্গে কথা বললেন তিনি। আমি দাঁড়িয়ে ঠায়। ফিরতে ফিরতে দুপুর গড়িয়ে বিকেলপ্রায়। এসেই খেয়েদেয়ে ডাইরি নিয়ে বসে গেলেন। অনিন্দ্যসুন্দর প্রকৃতির ভেতর থেকে ঘুরে এলেন কবি। কবিতাজ্বরে আক্রান্ত হওয়ারই কথা। আমি আর বিরক্ত করার সাহস পেলাম না। উচিতও হতো না।  


সন্ধ্যা সাড়ে পাঁচটায় আমাদের অনুষ্ঠান। কবি ঘুম থেকে উঠলেন একটু দেরিতে। আমাদের পৌঁছাতে পৌঁছাতে ছটা বেজে গেল। বাসা থেকে বিদায় নিয়ে নিলেন। অনুষ্ঠান শেষে ওখানেই খাওয়াদাওয়া সেরে ফিরতি গাড়ি ধরবেন। সকলে অধির আগ্রহে অপেক্ষা করছিল। আমাদের যাওয়া মাত্রই এগিয়ে এসে একে একে কবির সঙ্গে হাত মেলাল। উনি কিছুটা বিস্মিত হয়ে সামলে নিলেন নিজেকে। 
‘আপনি আসছেন শুনে কটা দিন তো ঘুমই হয়নি।’ কবি হারুণ পাশা হাত মেলাতে মেলাতে বললেন। 
‘এই যে একেবারে আসেন না, এটা কিন্তু ভারি অন্যায়।’ সফি ভাইয়ের এই কথায় তো থতমত খেয়ে গেলেন তিনি। 

‘মানে আমাদের এই গেয়ো কবিদের উজ্জীবিত করতে মাঝেমধ্যে কিন্তু আপনাদের আসা উচিত।’ সফি ভাই আরেকটু খোলসা করে দিলেন। আমাদের কিছু তরুণ কবি শূন্যে তুলে উনাকে মঞ্চের মধ্য-আসনে বসালেন। পেছনে ব্যানার, কটকটে লাল অক্ষরে লেখা: কবিতা আসর। নিচে তারিখ ও স্থান। এতক্ষণে কবির চোখ পড়লো সেখানে। ঘোষক হাসনাত একবার মাইক্রোফোনের সামনে দাঁড়িয়ে ‘প্রিয় সুধী’ বলে আবার ফিরে গেল মঞ্চের কাছে। ‘স্যার, কিছু মনে করবেন না, আপনার নামটা, প্লিজ?’ হাত দুটো বুকের কাছে কচলাতে কচলাতে একটু জড়সড় হয়ে কবিকে জিজ্ঞেস করল সে।
‘কবি।’ ছোট্ট করে উত্তর দিলেন কবি।
‘জি। দয়া করে আমাকে আর লজ্জা দেবেন না! আপনি যে নামে লেখেন?’
‘হুমায়ুন কবির।’  

ধন্যবাদ বলে হাসনাত ছুটে চলে গেল মাইক্রোফোনের সামনে: ‘বন্ধুগণ, আমাদের অধির আগ্রহের অবসান ঘটেছে। কবি এসে আমাদের মধ্য-আসনে বসেছেন। আজ আমাদের মাঝে উপস্থিত হয়েছেন দেশের প্রখ্যাত কবি হুমায়ুন কবির। তাঁর কবিতা আমরা প্রায়ই দেশের খ্যাতনামা পত্রিকা ও  দৈনিকে পড়ি। তিনি প্রকৃতি ও মানুষঘেঁষা কবি। বলতে পারেন প্রেম ও জাগরণের কবি। আমাদের মাঝে এই মহান কবিকে উপস্থিত করার জন্যে মেহেরপুর কবি-পরিষদের পক্ষ থেকে বিশেষভাবে ধন্যবাদ জানাই এই পরিষদের অন্যতম প্রতিষ্ঠাতা কবি মফেদুল হাসান ভাইকে। তার কারণেই আজ আমরা এই প্রথিতযশা কবির সান্নিধ্য পেলাম। ধন্য হলাম।’ 

আমার দিকে তাকালেন কবি। চোখটা লাল। হয়তো দেরি করে ঘুম থেকে ওঠার কারণে। চারিদিকে তখন অট্ট-হাততালি। 
‘আমরা কবির কবিতা ও বক্তব্য নিশ্চয় শুনবো। তার আগে আমাদের এই শহরের কয়েকজন কবিতাপ্রাণ ব্যক্তি কবি হুমায়ুন কবিরকে নিবেদন করে স্বরচিত কবিতা পাঠ করবেন।’ এরপর ঘোষক একের পর এক কবিকে মাইক্রোফোনে ডাকলেন। সবাই স্বরচিত পাঁচটি করে কবিতা পাঠ করলেন। আমার কবিতার সাইজ সবার চেয়ে খানিকটা ছোট বলে আমি পাঠ করলাম দশটি। তাছাড়া আমার সৌজন্যে রাজধানীর কবি আজ এই আসরের মধ্যমণি, তাই আমার একটু বাড়তি সুবিধা নেয়াটা যেন সকলের প্রত্যাশিত ছিল। কবি চুপচাপ কখনো গালে, কখনো মাথায়, কখনো থুতনিতে হাত দিয়ে আমাদের কবিতা শুনলেন। রাত নটার কিছু পরে শেষ হলো আমাদের কবিতাপাঠ। সবশেষে মাইক্রোফোন তুলে দেওয়া হলো কবির হাতে। তিনি বেশ কিছুক্ষণ নীরব থাকলেন মাইক্রোফোন হাতে। আমার দিকে একবার তাকালেন, তারপর ভাঙা ভাঙা স্বরে বলা শুরু করলেন। ততক্ষণে হল ভরে গেছে লোকজনে। 

‘আমি দুঃখ প্রকাশ করছি নিজে আপনাদের কোনো কবিতা শোনাতে পারছি না বলে। তবে আপনাদের কবিতা ভীষণ ভালো লাগলো। আপনারা সকলে খুব ভালো কবিতা লেখেন। আপনাদের আমি সফলতা কামনা করছি। আমার যাওয়ার সময় হয়ে এলো। আমাকে উঠতে হচ্ছে। আপনারা ক্ষমা করবেন। আপনাদের এত ভালোবাসা পাওয়ার যোগ্য আমি নই। আজকের এই অভিজ্ঞতা আজীবন মনে থাকবে।’  

লোকজন কবির লম্বা ভাষণ প্রত্যাশা করেছিল। আবার সন্ধ্যা থেকে কবিতা শুনে শুনে কিছুটা ক্লান্তও হয়ে পড়েছিল। ফলে কবির এই অল্পকথার ভাষণে ভালো মন্দের মিশেল অনুভূতি তৈরি হলো তাদের মনে। আমরা কবিরা প্রত্যাশা করেছিলাম আমাদের কবিতা নিয়ে উনি আরো কিছু বলবেন। সেটি হলো না বলে হতাশ যেমন হলাম তেমন নিজেদের কবিতা রাজধানীর একজন কবিকে শোনাতে পেরেছি ভেবে আনন্দও কম হলো না। 

‘আবার আসবেন?’ বাসে তুলে দিয়ে বললাম আমি। 
‘আসবো; তবে এবার নামটা বদলে আসতে হবে। এসেছিলাম ব্রিটিশ-আমেরিকান টোব্যাকো কোম্পানির জ্যোনাল ফ্যাক্টরি ম্যানেজার হয়ে এখানে তামাক চাষের সম্ভাবনা দেখতে। ফিরে যাচ্ছি প্রথিতযশা কবি হয়ে।’ একটু হেসে নিয়ে আবার বললেন, ‘কবি আমার নাম, কবির থেকে কবি হয়েছে, কিন্তু আমি কবি না, ভাই। আপনার সম্মানের দিকে তাকিয়ে ওখানে কিছু বলতে পারিনি!’ 

‘বাস ছেড়ি দিলু ভাই, নামতি হবে।’ বলে হাত ধরে টেনে আমাকে নামিয়ে দিলো সুপারভাইজার। ঠিক নামিয়ে না, বাঁচিয়ে দিলো বলা যায়।     

ট্যাগঃ

মফস্বলে রাজধানীর কবি

সময়ঃ ১২:০৪:১৬ অপরাহ্ন, বৃহস্পতিবার, ৯ এপ্রিল ২০২৬

‘ঢাকা থেকে কবি যাচ্ছেন, একদিনের জন্য। তোর ওখানে উঠবেন। শহরটা ঘুরে দেখবেন। ব্যবস্থা করিস।’ এসএমএসটা পাঠিয়েছে সবুর। আমার বন্ধু। বাংলাদেশ ব্যাংকের বড় কর্মকর্তা। ব্যাংকের রিজার্ভ চুরি হওয়ার ঘটনায় মহাব্যস্ত এখন। যৌবনে আবৃত্তিশিল্পী হিসেবে নামডাক ছিল বেশ। কলেজজীবনে আমার লেখা কতগুলো কবিতা প্রশংসিত হয়েছে ওর কারণেই। 

রাজধানীর একজন কবি আমার বাড়ি আসছেন জেনে ভীষণ ভালোলাগা কাজ করছিল। এই শহরে জাতীয়পর্যায়ে পরিচিত এমন কোনো কবি নেই। আমরা যারা টুকটাক লিখি, নিজেরাই পড়ে, নিজেরাই হইচই করি। বহুবার রাজধানী থেকে খ্যাতনামা কোনো কবিকে দাওয়াত করে নিজেদের কবিতা শোনাবো বলে ভেবেছি। একবার আনাও হয়েছিল জেলা প্রশাসকের সহযোগিতায়; বছরদশেক আগের কথা। জেলা প্রশাসক মহোদয় নিজেও ছিলেন কবি। তিনি রাজধানীর এক কবিকে দাওয়াত করে আনলেন। পেশায় উচ্চপদস্থ আমলা। এসেছিলেন চুয়াডাঙ্গায় শ্যালকের জন্য মেয়ে দেখতে। সুযোগ বুঝে প্রশাসক মহোদয় তাঁর বাসায় কবিতাপাঠের আসর বসালেন। দাওয়াত পেলাম আমরা কয়েকজন কবি, লেখক ও সাংস্কৃতিককর্মী। 

তিনদিন ধরে বাছাই করলাম নিজের কবিতা। কোনটা কোনটা পড়া যায় কিছুতেই ঠিক করতে পারছিলাম না। বৌকে ডেকে শোনাব সে সাহস নেই। ব্লগার হত্যা ইস্যুতে প্রতিবাদী কবিতা লিখে গলা ফাটিয়ে পাঠ করেছি। উগ্র ধর্মীয় মৌলবাদীদের মোটেও ভয় পাইনি। জীবন একটাই, একবারই যাবে! আপোস করে লাভ কি? কিন্তু বউয়ের সামনে কথাটা বলতে পারলাম না বলে জীবনে কিছু হলো না। কবির সঙ্গে থাকতে থাকতে ওর ভেতর চরম কবিতা-বিদ্বেষ তৈরি হয়েছে। অথচ কলেজে ফার্স্ট ইয়ারে কবিতা দিয়েই পটিয়েছিলাম ওকে। সে কথা স্মরণ করে আমাদের দুজনেরই আফসোসের অন্ত নেই আজ। অগত্যা কাজের মেয়ে জরিমালাকে জোর করে বসিয়ে পঞ্চাশটা শুনিয়ে বিশটার একটা তালিকা তৈরি হলো। কেবল জোরে কাজ হলো না, পঞ্চাশ টাকার নোটও একটা ফেলতে হলো। 

সেবার রাতভোর চলল কবিতাপাঠের আসর। একের পর এক ক্লান্তিহীন স্বরচিত কবিতা পাঠ করে চললেন ডিসি সাহেব। সবচেয়ে বিরক্তির বিষয় হলো, দশ লাইনের কবিতার কখনো কখনো একঘণ্টার ব্যাখ্যা দিয়ে তিনি প্রতিষ্ঠা করেন কবিতাটি কেন মহান। নিজের বোধ-বুদ্ধি চাপিয়ে দেন কবিতার উপর, তা সে কবিতার ভেতর থাক আর না থাক।   

সমানে নিজের কবিতা পাঠ করলেন আগত কবিও। তিনিও তার কবিতার ব্যাখ্যা দিতে ভুুললেন না। পাশাপাশি তার কবিতাটির মতো আর কোনো কবিতা বাংলা সাহিত্যে লেখা হয়নি উল্লেখ করে কেন লেখা হয়নি তারও একটা জবাব তিনি দিয়ে গেলেন। ডিসি সাহেবের মেয়ে একটা ছড়া লিখেছিল কোনো একদিন, সেটিও শোনা হলো মেয়ের স্বকণ্ঠে। এর বাইরে আমরা গোটাদশেক কবি অপেক্ষা করে জীবন ও শিল্পের প্রতি সব ধরনের রুচি হারিয়ে চোখ ফোলাফোলা অবস্থা করে ভোরে বাড়ি ফিরলাম। ফেরার সময় ডিসি সাহেবের বিশেষ সহকারী আমাদের স্বাক্ষর নিয়ে একটি করে খাম ধরিয়ে দিলেন। বাসায় এসে দেখি চকচকা পাঁচশ টাকার একখানা নোট। কবিজীবনে প্রথম আয়, শেষ আয়ও হতে পারে, তবে সেটি হলো কবিতা কাগজে ছাপিয়ে বা পাঠ করে নয়, অন্যের কবিতা শুনে। আফসোসটা এখানেই। আমার ধর্মসঙ্গী চিলের মতো ছোঁ মেরে নোটটা নিয়ে নিলো, এই প্রথম খুশি হতে দেখলাম ওকে। 

‘একরাতে পাঁচশ টাকা? আমি গেলে কিন্তু পাঁচ হাজারের কমে ফিরতাম না!’ মশকরার ছলে বাঁশমারার শিল্পটা ওর ভালোমতোই জানা। পরে জেনেছি, ঐ আসর ঘিরে মোটা অঙ্কের বাজেট বের করেছিলেন ডিসি সাহেব। আমাদের স্বাক্ষরযুক্ত খাতায় পাঁচশ টাকার শেষে অতিরিক্ত একটা শূন্য যোগ করে সেই বাজেট জমা পড়েছিল সরকারি খাতায়। এরপর আর সেই ইতিহাসের পুনরাবৃত্তি ঘটেনি। ঘটেনি কারণ প্রমোশন পেয়ে অতি দ্রুতই সরে পড়লেন আমাদের কবি-প্রশাসক। এতে আমাদের মন খারাপ এবং ভালো দুটোই হলো।


এতদিন পর রাজধানী থেকে কবি আসছেন আমাদের এই মফস্বল শহরে। আমি আনন্দ-সংবাদটা সঙ্গে সঙ্গে ভাগাভাগি করলাম কবিবন্ধুদের সঙ্গে। ওরা সমান খুশি। এইবার আমাদের কবিতা রাজধানীমুখি হবে। রাজধানীর একজন স্বনামধন্য কবি আমাদের কবিতা শুনবেন। দুটো ভালোমন্দ বলবেন। এটা কম কিসের! 
‘কবির পুরা নাম কিরে মফেদুল?’ সফিক প্রশ্ন করেছিল।
‘আসলেই জানতে পারবি। আমরা কি আর দেশের সব কবি চিনি!’ জবাব দিলাম আমি। 
‘দেখিস, রাজধানীর কাক না আবার চলি আসে!’ বাঁকা হাসিটা টেনে বলেছিল হাবিবুল্লাহ। আমাদের অতি-উৎসাহে বালিমারা ওর বরাবরের অভ্যাস।
‘নিজে কবিতা লিখতে পারিসনি বুলি কবি আসার সংবাদে গা জ্বলচি তোর; না?’ ত্যাড়া উত্তর দেন কবি বাহার-ভাই।
‘গল্প লিকি। কবিতা লিকিনি বুলি খুটা দিতি পারো না বাহার-ভাই। এই শহরে কবি মেলা আছে। গল্পকার কেউ আছে তেমুন, দেকাও? এজন্যি অন্তত তুমাদের উচিত আমাকে সম্মান দেখানুর।’ পাল্টা জবাব দেয় হাবিবুল্লাহ।
‘আইচ্চা, দেকালাম!’ বলেই উঠে আর্মি স্টাইলে সালাম ঠোকে পাশে বসা আকবর মাস্টার। স্কুলে পড়া অবস্থায় টিউশনি করতে গিয়ে নামের শেষে মাস্টার পদবিটা কামিয়েছে। তারপর কয়েকবার হাই স্কুল ফেল করে মিষ্টির দোকান বসিয়েছে। কিন্তু নামটা সেই আকবর মাস্টারই থেকে গেল। 

আমরা ঠিক করলাম রাজধানীর কবির সঙ্গে আড্ডা ও কবিতাপাঠের আসরটা হবে শিল্পকলা একাডেমির নাট্যমঞ্চে। বহুদিন থেকে মঞ্চটা পড়ে আছে অনুষ্ঠানহীন। মাঝে একবার ইসলামি গানের প্রতিযোগিতা হয়েছিল। শেষ কবে নাটক হয়েছিল আমাদের খুব কষ্ট করে মনে করতে হবে এখন। শহরের কবিদের জানানো হলো। সকলে বেশ আগ্রহ নিয়ে নিজেদের কবিতা নির্বাচনে লেগে গেল। আমাদের বাড়িতে এখন কাজ করছে জিল্লুর মা। টাকা দিলে ও করে না হেন কাজ নেই। কিন্তু সমস্যা হলো অন্যখানে- একেবারে কানে শোনে না। বাড়ির পেছনে আছে এক কামারঘর। আজকাল কাজ তেমন জোটে না। ওকে গিয়ে ধরলাম। ত্রিশ টাকা, একঘণ্টা।


কবি এসে পৌঁছাবেন সন্ধ্যায় সিদ্ধান্ত হলো, পরদিন দুপুর পর্যন্ত শহরটা ঘুরিয়ে বিকেল সাড়ে পাঁচটায় বসবে কবিতার আসর। রাতের গাড়িতে আবার ফিরে যাবেন তিনি। আমি নিজে বাড়ির অতিথি কক্ষটা গোছালাম। বাথরুমের ওপরে বস্তাবন্দি করে রাখা বইগুলো নামাতে হলো। বেছে বেছে নামিদামী বইগুলো ঘরে সাজিয়ে রাখলাম। বিছানায় বালিশের কাছে রাখলাম ‘শেষের কবিতা’।

কবি এলেন সন্ধ্যা ছটায় জেআর পরিবহনে। একটা চামড়ার ব্যাগ হাতে। পরিপাটি পোশাক। দেখতেও বেশ হ্যান্ডসাম। রাজধানীর কবি বলে কথা! আমার দিকে এগিয়ে এসে হাতটা বাড়িয়ে দিয়ে বললেন, ‘যদি ভুল না করি, আপনি মফেদুল হাসান?’ 
‘কিন্তু বুঝলেন কিভাবে?’ হ্যাঁ সূচক মাথা নেড়ে উত্তর দিলাম আমি।
‘সবুর আপনার ডিটেইল বলে দিয়েছে। এতটা নির্ভুল বলতে পারবে ভাবিনি।’
‘আমার সম্পর্কে আর কিছু বলেনি সবুর?’ রিকশায় উঠে নিচুস্বরে জিজ্ঞাসা করলাম। 
‘আপনি একবার অঙ্ক পরীক্ষায় খাতা বদলে সবুরকে পাস করিয়ে দিয়েছিলেন। চুক্তি হয়েছিল বাংলাটা সবুর দেখে দেবে। কিন্তু সেদিন আপনাদের কক্ষে সবচেয়ে কড়া মাস্টারমশাইয়ের গার্ড পড়লো। আপনি বাংলায় ফেল করলেন।’ হাসতে হাসতে বললেন কবি। আমার ভেতর উচ্ছ্বাসের বেলুনটা ফুটো হয়ে গেল তৎক্ষণাৎ। সবুর আর বলার বিষয় পেলো না? এখন কোন মুখ নিয়ে বলি আমি কবি, কবিতা লিখে এলাকার সাংস্কৃতিক অঙ্গনে বেশ নামডাক হয়েছে। অগত্যা আলাপের লাগাম টেনে ধরতে হলো। 

‘বাহ! আপনার তো দেখছি পড়ার অভ্যাস আছে।’ ঘরে ঢুকে এদিক-সেদিক ছড়ানো ছিটানো কবিতার বইপত্র দেখে বললেন কবি। কোনো এক কারণে কিঞ্চিৎ বিরক্তও মনে হলো তাকে। 
‘তারপর আপনার লেখালেখি কেমন চলছে?’ রাতে খাবার টেবিলে জিজ্ঞেস করলাম আমি। আমি যে কবিতা লিখি সেটি সবুর বলে দিলে আলাপ জমাতে কি সুবিধাটাই না হতো! মনে মনে ভাবলাম আমি। 
‘ল্যাপটপ আর ট্যাবের যুগে কে আর হাতে লেখে বলুন? তাছাড়া টুকটাক প্রয়োজনে অফিসে কম্পোজিটর তো আছেই।’ বললেন কবি। 
‘সেই তো!’ যোগ করলাম আমি। ‘আমরা অবশ্য হাতেই লিখি। প্রয়োজন হলে দোকান থেকে কম্পোজ করিয়ে আনি।’ 
‘আচ্ছা।’ খেতে খেতে ছোট্ট করে বললেন তিনি। আমিও লিখি শুনে বিশেষ আগ্রহ তার চোখেমুখে দেখলাম না। 
‘খাওয়ার সময় লেখালেখির প্রসঙ্গ বাদ দাও তো!’ বৌয়ের মৃদু হিড়িকে আরো দমে যেতে হলো। সেই রাতে আলাপ বিশেষ এগুলো না। কিছু কবিতা রেখেছিলাম হাতের কাছে, ভেবেছিলাম খাওয়া শেষ করে পড়ে শোনাবো, সেটিও হলো না। 


‘নাস্তাটা সেরে শহরটা ঘুরে আসি?’ চায়ের ট্রে সামনে রেখে বললাম আমি।
‘এই পুচকে শহর আর কি দেখবো বলুন, শহরেই তো জীবনটা কাটলো।’ বললেন কবি।
‘তা যা বলেছেন। বাংলাদেশের সবচেয়ে ছোট জেলা এটা। তার ওপর আপনি এসেছেন রাজধানী থেকে। তবে সবুর লিখেছে আপনি শহরটা ঘুরবেন, তাই বললাম।’ 
‘ও ব্যাংকের কাজে ভীষণ ব্যস্ত, তাই ডিটেইল বলা হয়নি ওকে। আমাকে এখানকার মাঠে নিয়ে যাওয়ার একটু ব্যবস্থা করেন। রড-সিমেন্টের ভেতর বড় হওয়া; প্রকৃতির সঙ্গে কাটাই কিছুটা সময়; কি বলেন?’ বললেন কবি। 
‘তাই তো! প্রস্তাবটি আমার দিক থেকেই আসা উচিত ছিল। আপনি রাজধানীর মানুষ, এখানকার টিয়ে-সবুজ মেঘাচ্ছন্ন প্রকৃতি দেখলে মনটা ভরে উঠবে আপনার।’ কণ্ঠে উচ্ছ্বাস মেখে বলি আমি। ‘টিয়ে-সবুজ’? বাহ্, উপমাটা দারুণ হয়েছে তো! তবে ‘মেঘাচ্ছন্ন প্রকৃতি’ বলা ঠিক হলো বোধহয়। মনে মনে ভাবি আমি। 

নাস্তা শেষ করে আমরা ভৌরব টপকে নিশ্চিন্তপুরের মাঠে যাই। ‘দুপুরেই ফিরতে হবে। বিকেলে আবার আপনার আগমনে আমরা বন্ধুরা একটা সামান্য অনুষ্ঠানের আয়োজন করেছি।’ মাঠের আইল ধরে আগেপিছে হাঁটতে হাঁটতে বললাম আমি। 
‘দশটার গাড়িতে ফিরতি টিকিট বুকিং আছে। তার আগপর্যন্ত আছি আপনার সঙ্গে।’ বললেন কবি। আমরা হাঁটতে হাঁটতে অনেকটা ভিতরে চলে যাই।  
‘আচ্ছা, আপনাদের এখানে তো সব ধানী জমি?’ প্রশ্ন করেন কবি। 
‘জি। অন্যান্য ফসলও হয়।’ 
‘যেমন?’
‘বর্ষায় পাট। শীতে গম। আর এখন সবজি চাষ করছে অনেকে। কলার চাষও হচ্ছে কোথাও কোথাও। তবে চাষবাসের বিষয়ে আমার জ্ঞানবিশেষ নেই। আপনার বদৌলতে বহুদিন পর এদিকটায় আসা হলো।’  

‘আচ্ছা। কৃষকদের সঙ্গে একটু কথা বলা যায়, কি বলেন?’ বলেই কয়েকজন কৃষক নিড়ানি দিয়ে শূন্য জমিন চাষের জন্য প্রস্তুত করছিল সেদিকে হনহন করে চলে গেলেন কবি। আমি খানিকটা পিছনে পড়ে থাকলাম। রোদে তাপ ধরতে শুরু করেছে। একটা বাবলা গাছের মৃদুছায়ায় আশ্রয় নিতে হলো। আশেপাশের প্রায় সব কৃষকের সঙ্গে কথা বললেন তিনি। আমি দাঁড়িয়ে ঠায়। ফিরতে ফিরতে দুপুর গড়িয়ে বিকেলপ্রায়। এসেই খেয়েদেয়ে ডাইরি নিয়ে বসে গেলেন। অনিন্দ্যসুন্দর প্রকৃতির ভেতর থেকে ঘুরে এলেন কবি। কবিতাজ্বরে আক্রান্ত হওয়ারই কথা। আমি আর বিরক্ত করার সাহস পেলাম না। উচিতও হতো না।  


সন্ধ্যা সাড়ে পাঁচটায় আমাদের অনুষ্ঠান। কবি ঘুম থেকে উঠলেন একটু দেরিতে। আমাদের পৌঁছাতে পৌঁছাতে ছটা বেজে গেল। বাসা থেকে বিদায় নিয়ে নিলেন। অনুষ্ঠান শেষে ওখানেই খাওয়াদাওয়া সেরে ফিরতি গাড়ি ধরবেন। সকলে অধির আগ্রহে অপেক্ষা করছিল। আমাদের যাওয়া মাত্রই এগিয়ে এসে একে একে কবির সঙ্গে হাত মেলাল। উনি কিছুটা বিস্মিত হয়ে সামলে নিলেন নিজেকে। 
‘আপনি আসছেন শুনে কটা দিন তো ঘুমই হয়নি।’ কবি হারুণ পাশা হাত মেলাতে মেলাতে বললেন। 
‘এই যে একেবারে আসেন না, এটা কিন্তু ভারি অন্যায়।’ সফি ভাইয়ের এই কথায় তো থতমত খেয়ে গেলেন তিনি। 

‘মানে আমাদের এই গেয়ো কবিদের উজ্জীবিত করতে মাঝেমধ্যে কিন্তু আপনাদের আসা উচিত।’ সফি ভাই আরেকটু খোলসা করে দিলেন। আমাদের কিছু তরুণ কবি শূন্যে তুলে উনাকে মঞ্চের মধ্য-আসনে বসালেন। পেছনে ব্যানার, কটকটে লাল অক্ষরে লেখা: কবিতা আসর। নিচে তারিখ ও স্থান। এতক্ষণে কবির চোখ পড়লো সেখানে। ঘোষক হাসনাত একবার মাইক্রোফোনের সামনে দাঁড়িয়ে ‘প্রিয় সুধী’ বলে আবার ফিরে গেল মঞ্চের কাছে। ‘স্যার, কিছু মনে করবেন না, আপনার নামটা, প্লিজ?’ হাত দুটো বুকের কাছে কচলাতে কচলাতে একটু জড়সড় হয়ে কবিকে জিজ্ঞেস করল সে।
‘কবি।’ ছোট্ট করে উত্তর দিলেন কবি।
‘জি। দয়া করে আমাকে আর লজ্জা দেবেন না! আপনি যে নামে লেখেন?’
‘হুমায়ুন কবির।’  

ধন্যবাদ বলে হাসনাত ছুটে চলে গেল মাইক্রোফোনের সামনে: ‘বন্ধুগণ, আমাদের অধির আগ্রহের অবসান ঘটেছে। কবি এসে আমাদের মধ্য-আসনে বসেছেন। আজ আমাদের মাঝে উপস্থিত হয়েছেন দেশের প্রখ্যাত কবি হুমায়ুন কবির। তাঁর কবিতা আমরা প্রায়ই দেশের খ্যাতনামা পত্রিকা ও  দৈনিকে পড়ি। তিনি প্রকৃতি ও মানুষঘেঁষা কবি। বলতে পারেন প্রেম ও জাগরণের কবি। আমাদের মাঝে এই মহান কবিকে উপস্থিত করার জন্যে মেহেরপুর কবি-পরিষদের পক্ষ থেকে বিশেষভাবে ধন্যবাদ জানাই এই পরিষদের অন্যতম প্রতিষ্ঠাতা কবি মফেদুল হাসান ভাইকে। তার কারণেই আজ আমরা এই প্রথিতযশা কবির সান্নিধ্য পেলাম। ধন্য হলাম।’ 

আমার দিকে তাকালেন কবি। চোখটা লাল। হয়তো দেরি করে ঘুম থেকে ওঠার কারণে। চারিদিকে তখন অট্ট-হাততালি। 
‘আমরা কবির কবিতা ও বক্তব্য নিশ্চয় শুনবো। তার আগে আমাদের এই শহরের কয়েকজন কবিতাপ্রাণ ব্যক্তি কবি হুমায়ুন কবিরকে নিবেদন করে স্বরচিত কবিতা পাঠ করবেন।’ এরপর ঘোষক একের পর এক কবিকে মাইক্রোফোনে ডাকলেন। সবাই স্বরচিত পাঁচটি করে কবিতা পাঠ করলেন। আমার কবিতার সাইজ সবার চেয়ে খানিকটা ছোট বলে আমি পাঠ করলাম দশটি। তাছাড়া আমার সৌজন্যে রাজধানীর কবি আজ এই আসরের মধ্যমণি, তাই আমার একটু বাড়তি সুবিধা নেয়াটা যেন সকলের প্রত্যাশিত ছিল। কবি চুপচাপ কখনো গালে, কখনো মাথায়, কখনো থুতনিতে হাত দিয়ে আমাদের কবিতা শুনলেন। রাত নটার কিছু পরে শেষ হলো আমাদের কবিতাপাঠ। সবশেষে মাইক্রোফোন তুলে দেওয়া হলো কবির হাতে। তিনি বেশ কিছুক্ষণ নীরব থাকলেন মাইক্রোফোন হাতে। আমার দিকে একবার তাকালেন, তারপর ভাঙা ভাঙা স্বরে বলা শুরু করলেন। ততক্ষণে হল ভরে গেছে লোকজনে। 

‘আমি দুঃখ প্রকাশ করছি নিজে আপনাদের কোনো কবিতা শোনাতে পারছি না বলে। তবে আপনাদের কবিতা ভীষণ ভালো লাগলো। আপনারা সকলে খুব ভালো কবিতা লেখেন। আপনাদের আমি সফলতা কামনা করছি। আমার যাওয়ার সময় হয়ে এলো। আমাকে উঠতে হচ্ছে। আপনারা ক্ষমা করবেন। আপনাদের এত ভালোবাসা পাওয়ার যোগ্য আমি নই। আজকের এই অভিজ্ঞতা আজীবন মনে থাকবে।’  

লোকজন কবির লম্বা ভাষণ প্রত্যাশা করেছিল। আবার সন্ধ্যা থেকে কবিতা শুনে শুনে কিছুটা ক্লান্তও হয়ে পড়েছিল। ফলে কবির এই অল্পকথার ভাষণে ভালো মন্দের মিশেল অনুভূতি তৈরি হলো তাদের মনে। আমরা কবিরা প্রত্যাশা করেছিলাম আমাদের কবিতা নিয়ে উনি আরো কিছু বলবেন। সেটি হলো না বলে হতাশ যেমন হলাম তেমন নিজেদের কবিতা রাজধানীর একজন কবিকে শোনাতে পেরেছি ভেবে আনন্দও কম হলো না। 

‘আবার আসবেন?’ বাসে তুলে দিয়ে বললাম আমি। 
‘আসবো; তবে এবার নামটা বদলে আসতে হবে। এসেছিলাম ব্রিটিশ-আমেরিকান টোব্যাকো কোম্পানির জ্যোনাল ফ্যাক্টরি ম্যানেজার হয়ে এখানে তামাক চাষের সম্ভাবনা দেখতে। ফিরে যাচ্ছি প্রথিতযশা কবি হয়ে।’ একটু হেসে নিয়ে আবার বললেন, ‘কবি আমার নাম, কবির থেকে কবি হয়েছে, কিন্তু আমি কবি না, ভাই। আপনার সম্মানের দিকে তাকিয়ে ওখানে কিছু বলতে পারিনি!’ 

‘বাস ছেড়ি দিলু ভাই, নামতি হবে।’ বলে হাত ধরে টেনে আমাকে নামিয়ে দিলো সুপারভাইজার। ঠিক নামিয়ে না, বাঁচিয়ে দিলো বলা যায়।