০৯:৫৬ পূর্বাহ্ন, শুক্রবার, ০৬ মার্চ ২০২৬, ২২ ফাল্গুন ১৪৩২ বঙ্গাব্দ

ইরানে হামলার মধ্যেই যুক্তরাষ্ট্রের যুদ্ধের নতুন ফ্রন্ট ‘লাতিন আমেরিকা’?

  • Voice24 Admin
  • সময়ঃ ১২:০৬:১৪ পূর্বাহ্ন, শুক্রবার, ৬ মার্চ ২০২৬
  • ৫৪৩ Time View

যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের সঙ্গে ইরানের যুদ্ধ এখনো তীব্রভাবে চলতে থাকায় পরিস্থিতি ক্রমেই উত্তপ্ত হচ্ছে। ওয়াশিংটন মধ্যপ্রাচ্যে আরো সৈন্য ও সামরিক সরঞ্জাম পাঠানোর প্রতিশ্রুতি দিয়েছে, আর তেহরানও পাল্টা হামলা পুরো অঞ্চলে ছড়িয়ে দিচ্ছে।

কিন্তু বৃহস্পতিবার যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের প্রশাসনের শীর্ষ কর্মকর্তারা আরেকটি সামরিক ফ্রন্টের দিকে দৃষ্টি দিয়েছেন, আর সেটি হলো- লাতিন আমেরিকা।

দ্বিতীয় মেয়াদে ক্ষমতায় আসার পর থেকেই ট্রাম্প ইঙ্গিত দিয়ে যাচ্ছেন, তিনি পুরো পশ্চিম গোলার্ধে যুক্তরাষ্ট্রের প্রভাব ও আধিপত্য জোরদার করতে চান। এ লক্ষ্য বাস্তবায়নের অংশ হিসেবে অঞ্চলজুড়ে অপরাধী নেটওয়ার্কের বিরুদ্ধে সামরিক অভিযানও চালানো হচ্ছে।

বৃহস্পতিবার (৫ মার্চ) হোয়াইট হাউসে প্রথম ‘আমেরিকাস কাউন্টার কার্টেল কনফারেন্স’ অনুুষ্ঠিত হয়েছে। সম্মেলনে হোয়াইট হাউসের নিরাপত্তা উপদেষ্টা স্টিফেন মিলার বলেন, “মধ্যপ্রাচ্যে যা-ই ঘটুক না কেন, লাতিন আমেরিকা যুক্তরাষ্ট্রের জন্য একটি গুরুত্বপূর্ণ সামরিক অগ্রাধিকার হিসেবেই থাকবে।”

তিনি বলেন, “এই গোলার্ধের এক ইঞ্চি জায়গাও আমরা আমাদের শত্রুদের কাছে ছেড়ে দেব না।”

মিলার আরো বলেন, যুক্তরাষ্ট্র কঠোর শক্তি, সামরিক শক্তি এবং প্রয়োজনে প্রাণঘাতী বল প্রয়োগ করে দেশের নিরাপত্তা রক্ষা করবে।

তার মতে, মাদক চক্রের সমস্যার ফৌজদারি বিচারভিত্তিক কোনো সমাধান নেই। তিনি এসব কার্টেলকে (চক্র) আল-কায়েদা এবং ইসলামিক স্টেটের মতো সশস্ত্র গোষ্ঠীর সঙ্গে তুলনা করেন।

তিনি বলেন, “সংগঠিত অপরাধকে পরাজিত করা সম্ভব শুধু সামরিক শক্তির মাধ্যমে।”

গত বছর ট্রাম্প ক্ষমতায় আসার পর তার প্রশাসন লাতিন আমেরিকায় তথাকথিত ‘গ্লোবাল ওয়ার অন টেরর’ ধাঁচের কৌশল প্রয়োগ শুরু করেছে। এর অংশ হিসেবে অনেক মাদক কার্টেলকে ‘বিদেশি সন্ত্রাসী সংগঠন’ হিসেবে ঘোষণা করা হয়েছে।

তবে সমালোচকদের মতে, এই কঠোর নীতির ফলে মানবাধিকার ও আইনি জটিলতা তৈরি হতে পারে।

উদাহরণস্বরূপ, গত সেপ্টেম্বর থেকে যুক্তরাষ্ট্র ক্যারিবিয়ান সাগর ও পূর্ব প্রশান্ত মহাসাগরে সন্দেহভাজন মাদক পাচারের নৌকায় বিমান হামলা চালাতে শুরু করে। মানবাধিকার সংগঠনগুলো এসব হামলাকে বিচারবহির্ভূত হত্যাকাণ্ড বলে অভিযোগ করেছে।

এছাড়া জানুয়ারির শুরুতে যুক্তরাষ্ট্র ভেনেজুয়েলার নেতা নিকোলাস মাদুরোকে অপহরণের জন্য একটি বিশেষ অভিযান চালায়। একই সঙ্গে কিউবার কমিউনিস্ট সরকারকে দুর্বল করার উদ্দেশ্যে চাপ সৃষ্টি করার নীতি চালু করেছে।

এই সপ্তাহেই পেন্টাগন ঘোষণা দিয়েছে, তারা ইকুয়েডরের সেনাবাহিনীর সঙ্গে যৌথভাবে ‘ঘোষিত সন্ত্রাসী সংগঠন’-এর বিরুদ্ধে অভিযান শুরু করেছে। এতে ভবিষ্যতে স্থল অভিযানের সম্ভাবনাও থাকতে পারে।

তবে একই সময়ে ইরানের সঙ্গে যুদ্ধ এবং লাতিন আমেরিকায় সামরিক তৎপরতা বাড়ানোর ফলে প্রশ্ন উঠেছে, যুক্তরাষ্ট্র কি এত বড় মাত্রার সামরিক কার্যক্রম একসঙ্গে দীর্ঘসময় ধরে চালিয়ে যেতে পারবে?

সম্মেলনে যুক্তরাষ্ট্রের প্রতিরক্ষামন্ত্রী পিট হেগসেথ বলেন, প্রয়োজনে যুক্তরাষ্ট্র একাই লাতিন আমেরিকার কার্টেলগুলোর বিরুদ্ধে আক্রমণাত্মক পদক্ষেপ নিতে প্রস্তুত।

তিনি বলেন, “আমাদের ইচ্ছা অবশ্যই একসঙ্গে কাজ করা। তবে প্রয়োজন হলে আমরা একাই আক্রমণ চালাতে প্রস্তুত।”

এই নীতির ভিত্তি ১৮২৩ সালের ‘মনরো ডকট্রিন’, যার মাধ্যমে পশ্চিম গোলার্ধকে ইউরোপের প্রভাব থেকে আলাদা একটি মার্কিন প্রভাবক্ষেত্র হিসেবে প্রতিষ্ঠার চেষ্টা করা হয়েছিল।

এদিকে ট্রাম্প প্রশাসনের বক্তব্যে ধর্মীয় ও সভ্যতাগত বিষয়ও উঠে এসেছে। ট্রাম্প বলেছেন, ইরানের সরকার সভ্যতার বিরুদ্ধেই যুদ্ধ ঘোষণা করেছে।

সমালোচকদের মতে, এই বক্তব্য ট্রাম্প প্রশাসনের খ্রিস্টান জাতীয়তাবাদী দৃষ্টিভঙ্গি এবং পশ্চিমা সভ্যতাকে রক্ষার ধারণার সঙ্গে যুক্ত।

সম্মেলনে মিলার ইউরোপের ইতিহাসের উদাহরণ দিয়ে বলেন, ১৮ ও ১৯ শতকে শৃঙ্খলা বজায় রাখতে অনেক সময় কঠোর ও নির্মম পদ্ধতি ব্যবহার করা হয়েছিল।

অন্যদিকে হেগসেথ বলেন, সম্মেলনে উপস্থিত সব দেশই ‘পশ্চিমা সভ্যতার সন্তান’ এবং তাদের সিদ্ধান্ত নিতে হবে তারা কি শক্তিশালী সীমান্ত, আইনের শাসন ও খ্রিস্টান ঐতিহ্য বজায় রেখে পশ্চিমা দেশ হিসেবেই থাকবে কি না।

তিনি আরো সতর্ক করে বলেন, বিদেশি শক্তির প্রভাব- বিশেষ করে চীনের ক্রমবর্ধমান অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিক প্রভাব এই অঞ্চলের জন্য একটি বড় অস্তিত্বগত চ্যালেঞ্জ হয়ে উঠতে পারে।

ট্যাগঃ

ইরানে হামলার মধ্যেই যুক্তরাষ্ট্রের যুদ্ধের নতুন ফ্রন্ট ‘লাতিন আমেরিকা’?

সময়ঃ ১২:০৬:১৪ পূর্বাহ্ন, শুক্রবার, ৬ মার্চ ২০২৬

যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের সঙ্গে ইরানের যুদ্ধ এখনো তীব্রভাবে চলতে থাকায় পরিস্থিতি ক্রমেই উত্তপ্ত হচ্ছে। ওয়াশিংটন মধ্যপ্রাচ্যে আরো সৈন্য ও সামরিক সরঞ্জাম পাঠানোর প্রতিশ্রুতি দিয়েছে, আর তেহরানও পাল্টা হামলা পুরো অঞ্চলে ছড়িয়ে দিচ্ছে।

কিন্তু বৃহস্পতিবার যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের প্রশাসনের শীর্ষ কর্মকর্তারা আরেকটি সামরিক ফ্রন্টের দিকে দৃষ্টি দিয়েছেন, আর সেটি হলো- লাতিন আমেরিকা।

দ্বিতীয় মেয়াদে ক্ষমতায় আসার পর থেকেই ট্রাম্প ইঙ্গিত দিয়ে যাচ্ছেন, তিনি পুরো পশ্চিম গোলার্ধে যুক্তরাষ্ট্রের প্রভাব ও আধিপত্য জোরদার করতে চান। এ লক্ষ্য বাস্তবায়নের অংশ হিসেবে অঞ্চলজুড়ে অপরাধী নেটওয়ার্কের বিরুদ্ধে সামরিক অভিযানও চালানো হচ্ছে।

বৃহস্পতিবার (৫ মার্চ) হোয়াইট হাউসে প্রথম ‘আমেরিকাস কাউন্টার কার্টেল কনফারেন্স’ অনুুষ্ঠিত হয়েছে। সম্মেলনে হোয়াইট হাউসের নিরাপত্তা উপদেষ্টা স্টিফেন মিলার বলেন, “মধ্যপ্রাচ্যে যা-ই ঘটুক না কেন, লাতিন আমেরিকা যুক্তরাষ্ট্রের জন্য একটি গুরুত্বপূর্ণ সামরিক অগ্রাধিকার হিসেবেই থাকবে।”

তিনি বলেন, “এই গোলার্ধের এক ইঞ্চি জায়গাও আমরা আমাদের শত্রুদের কাছে ছেড়ে দেব না।”

মিলার আরো বলেন, যুক্তরাষ্ট্র কঠোর শক্তি, সামরিক শক্তি এবং প্রয়োজনে প্রাণঘাতী বল প্রয়োগ করে দেশের নিরাপত্তা রক্ষা করবে।

তার মতে, মাদক চক্রের সমস্যার ফৌজদারি বিচারভিত্তিক কোনো সমাধান নেই। তিনি এসব কার্টেলকে (চক্র) আল-কায়েদা এবং ইসলামিক স্টেটের মতো সশস্ত্র গোষ্ঠীর সঙ্গে তুলনা করেন।

তিনি বলেন, “সংগঠিত অপরাধকে পরাজিত করা সম্ভব শুধু সামরিক শক্তির মাধ্যমে।”

গত বছর ট্রাম্প ক্ষমতায় আসার পর তার প্রশাসন লাতিন আমেরিকায় তথাকথিত ‘গ্লোবাল ওয়ার অন টেরর’ ধাঁচের কৌশল প্রয়োগ শুরু করেছে। এর অংশ হিসেবে অনেক মাদক কার্টেলকে ‘বিদেশি সন্ত্রাসী সংগঠন’ হিসেবে ঘোষণা করা হয়েছে।

তবে সমালোচকদের মতে, এই কঠোর নীতির ফলে মানবাধিকার ও আইনি জটিলতা তৈরি হতে পারে।

উদাহরণস্বরূপ, গত সেপ্টেম্বর থেকে যুক্তরাষ্ট্র ক্যারিবিয়ান সাগর ও পূর্ব প্রশান্ত মহাসাগরে সন্দেহভাজন মাদক পাচারের নৌকায় বিমান হামলা চালাতে শুরু করে। মানবাধিকার সংগঠনগুলো এসব হামলাকে বিচারবহির্ভূত হত্যাকাণ্ড বলে অভিযোগ করেছে।

এছাড়া জানুয়ারির শুরুতে যুক্তরাষ্ট্র ভেনেজুয়েলার নেতা নিকোলাস মাদুরোকে অপহরণের জন্য একটি বিশেষ অভিযান চালায়। একই সঙ্গে কিউবার কমিউনিস্ট সরকারকে দুর্বল করার উদ্দেশ্যে চাপ সৃষ্টি করার নীতি চালু করেছে।

এই সপ্তাহেই পেন্টাগন ঘোষণা দিয়েছে, তারা ইকুয়েডরের সেনাবাহিনীর সঙ্গে যৌথভাবে ‘ঘোষিত সন্ত্রাসী সংগঠন’-এর বিরুদ্ধে অভিযান শুরু করেছে। এতে ভবিষ্যতে স্থল অভিযানের সম্ভাবনাও থাকতে পারে।

তবে একই সময়ে ইরানের সঙ্গে যুদ্ধ এবং লাতিন আমেরিকায় সামরিক তৎপরতা বাড়ানোর ফলে প্রশ্ন উঠেছে, যুক্তরাষ্ট্র কি এত বড় মাত্রার সামরিক কার্যক্রম একসঙ্গে দীর্ঘসময় ধরে চালিয়ে যেতে পারবে?

সম্মেলনে যুক্তরাষ্ট্রের প্রতিরক্ষামন্ত্রী পিট হেগসেথ বলেন, প্রয়োজনে যুক্তরাষ্ট্র একাই লাতিন আমেরিকার কার্টেলগুলোর বিরুদ্ধে আক্রমণাত্মক পদক্ষেপ নিতে প্রস্তুত।

তিনি বলেন, “আমাদের ইচ্ছা অবশ্যই একসঙ্গে কাজ করা। তবে প্রয়োজন হলে আমরা একাই আক্রমণ চালাতে প্রস্তুত।”

এই নীতির ভিত্তি ১৮২৩ সালের ‘মনরো ডকট্রিন’, যার মাধ্যমে পশ্চিম গোলার্ধকে ইউরোপের প্রভাব থেকে আলাদা একটি মার্কিন প্রভাবক্ষেত্র হিসেবে প্রতিষ্ঠার চেষ্টা করা হয়েছিল।

এদিকে ট্রাম্প প্রশাসনের বক্তব্যে ধর্মীয় ও সভ্যতাগত বিষয়ও উঠে এসেছে। ট্রাম্প বলেছেন, ইরানের সরকার সভ্যতার বিরুদ্ধেই যুদ্ধ ঘোষণা করেছে।

সমালোচকদের মতে, এই বক্তব্য ট্রাম্প প্রশাসনের খ্রিস্টান জাতীয়তাবাদী দৃষ্টিভঙ্গি এবং পশ্চিমা সভ্যতাকে রক্ষার ধারণার সঙ্গে যুক্ত।

সম্মেলনে মিলার ইউরোপের ইতিহাসের উদাহরণ দিয়ে বলেন, ১৮ ও ১৯ শতকে শৃঙ্খলা বজায় রাখতে অনেক সময় কঠোর ও নির্মম পদ্ধতি ব্যবহার করা হয়েছিল।

অন্যদিকে হেগসেথ বলেন, সম্মেলনে উপস্থিত সব দেশই ‘পশ্চিমা সভ্যতার সন্তান’ এবং তাদের সিদ্ধান্ত নিতে হবে তারা কি শক্তিশালী সীমান্ত, আইনের শাসন ও খ্রিস্টান ঐতিহ্য বজায় রেখে পশ্চিমা দেশ হিসেবেই থাকবে কি না।

তিনি আরো সতর্ক করে বলেন, বিদেশি শক্তির প্রভাব- বিশেষ করে চীনের ক্রমবর্ধমান অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিক প্রভাব এই অঞ্চলের জন্য একটি বড় অস্তিত্বগত চ্যালেঞ্জ হয়ে উঠতে পারে।