নির্বাচিত সরকারকে ক্ষমতাচ্যুত করার পাঁচ বছর পর মিয়ানমারের জান্তাপ্রধান মিন হং হ্লাইং পার্লামেন্টের ভোটাভুটিতে জিতে দেশটির প্রেসিডেন্ট হয়েছেন, যার মাধ্যমে যুদ্ধবিধ্বস্ত এই দেশে তার রাজনৈতিক ক্ষমতা আনুষ্ঠানিকভাবে আরো পোক্ত হলো।
আলজাজিরা লিখেছে, সিনিয়র জেনারেল মিন অং হ্লাইং শুক্রবার (৩ এপ্রিল) দেশটির সামরিকপন্থি পার্লামেন্টে সংসদ সদস্যদের ৫৮৪টি ভোটের মধ্যে ৪২৯টি পেয়ে জয়ী হয়েছেন। এই ফলাফল ঘোষণা করেছেন পার্লামেন্টের উচ্চ ও নিম্নকক্ষের যৌথ স্পিকার অং লিন দ্বে।
মিয়ানমারে জাতিগত নিধনের মুখে বাংলাদেশে পালিয়ে আসা প্রায় ১১ লাখ রোহিঙ্গাকে ফিরিয়ে নেওয়ার বিষয়ে কার্যত কোনো উদ্যোগ নেয়নি হ্লাইংয়ের নেতৃত্বাধীন জান্তা সরকার। আন্তর্জাতিক আদালতে মিয়ানমারের বিরুদ্ধে রোহিঙ্গা গণহত্যার মামলা চলছে। এদিকে বাংলাদেশ সরকারও রোহিঙ্গাদের প্রত্যাবাসনের কূটনৈতিক প্রচেষ্টা অব্যাহত রাখলেও সেই অর্থে কোনো সুখবর আজো মেলেনি।
৬৯ বছর বয়সি মিন অং হ্লাইং ২০২১ সালে নোবেল শান্তি পুরস্কার বিজয়ী অং সান সু চির সরকারের বিরুদ্ধে অভ্যুত্থান ঘটান এবং তাকে আটক করেন। এর ফলে ব্যাপক বিক্ষোভ শুরু হয়, যা পরে সামরিক নেতৃত্বের বিরুদ্ধে দেশজুড়ে সশস্ত্র প্রতিরোধে রূপ নেয়।
গত পাঁচ বছর ধরে মিয়ানমারে গৃহযুদ্ধ চলছে, যা শেষ হওয়ার লক্ষণ নেই। সু চিকেও রাখা হয়েছে গৃহবন্দি করে।
শীর্ষ জেনারেল থেকে বেসামরিক প্রেসিডেন্টে তার এই রূপান্তরটি আসে ডিসেম্বর ও জানুয়ারিতে অনুষ্ঠিত একতরফা নির্বাচনের পর, যেখানে সেনাবাহিনী-সমর্থিত একটি দল বড় ব্যবধানে জয়ী হয়। সমালোচক ও পশ্চিমা সরকারগুলো এই নির্বাচনকে ‘প্রহসন’ বলে আখ্যা দিয়েছে, যা গণতন্ত্রের আড়ালে সামরিক শাসন ধরে রাখার একটি চেষ্টা।
সামরিকপন্থি ইউনিয়ন সলিডারিটি অ্যান্ড ডেভেলপমেন্ট পার্টি নির্বাচনে প্রতিদ্বন্দ্বিতাপূর্ণ আসনের ৮০ শতাংশেরও বেশি জয় পায়। অন্যদিকে, সশস্ত্র বাহিনীর কর্মরত সদস্যরা নির্বাচিত না হয়েও সংসদের মোট আসনের এক-চতুর্থাংশ দখল করে আছে।
শুক্রবার পার্লামেন্টের ভোটের সরাসরি সম্প্রচারে দেখা যায়, পূর্বাভাস অনুযায়ী মিন অং হ্লাইং দ্রুতই জয়ের জন্য প্রয়োজনীয় সীমা অতিক্রম করেন। তিনি এই সপ্তাহের শুরুতে মনোনীত তিনজন প্রার্থীর একজন ছিলেন। বাকি দুজন ভাইস প্রেসিডেন্ট হন।
প্রেসিডেন্ট পদে মিন অং হ্লাইংয়ের এই আরোহন ঘটেছে মিয়ানমারের সশস্ত্র বাহিনীর নেতৃত্বে বড় ধরনের রদবদলের পর। তিনি ২০১১ সাল থেকে এই বাহিনীর নেতৃত্বে ছিলেন।
আলজাজিরা লিখেছে, বিশ্লেষকদের মতে দীর্ঘদিন ধরেই বেসামরিক প্রেসিডেন্ট পদে বসতে চাচ্ছিলেন মিন অং হ্লাইং।
জেনারেল হ্লাইং আগে সেনাবাহিনীর প্রধানের পদ ছেড়ে দেন, কারণ সংবিধান অনুযায়ী একজন প্রেসিডেন্ট একই সঙ্গে সর্বোচ্চ সামরিক পদে থাকতে পারেন না।
হ্লাইংয়ের ঘনিষ্ঠ সহযোগী এবং সাবেক গোয়েন্দা প্রধান ইয়েই উইন উকে সোমবার মিয়ানমারের সেনাপ্রধান পদে বসানো হয়। এই সেনাপ্রধান হ্লাইয়ের অত্যন্ত অনুগত হিসেবে পরিচিত।
আলজাজিরা লিখেছে, বিশ্লেষকদের মতে- সেনাবাহিনীর এই ক্ষমতা হস্তান্তর এবং হ্লাইংয়ের প্রেসিডেন্ট হওয়া একটি কৌশলগত পদক্ষেপ, যার লক্ষ্য বেসামরিক সরকারকে নামমাত্র ব্যবহার করে সরকারপ্রধান হিসেবে হ্লাইংয়ের ক্ষমতা আরো সুসংহত করা এবং আন্তর্জাতিক স্বীকৃতি অর্জন করা। একই সঙ্গে গত ছয় দশকের মধ্যে পাঁচ দশক সরাসরি দেশ শাসন করা সেনাবাহিনীর স্বার্থ রক্ষা করাও তার দায়িত্ব।
তবে গত পাঁচ বছরের বেশিরভাগ সময় ধরে চলা মিয়ানমারের গৃহযুদ্ধ এখনো তীব্র আকারে চলছে। এদিকে কিছু সামরিকবিরোধী গোষ্ঠী, যার মধ্যে অং সান সু চির দলের অবশিষ্ট অংশ এবং দীর্ঘদিনের জাতিগত সংখ্যালঘু বাহিনী রয়েছে; এই সপ্তাহে নতুন একটি যৌথ জোট গঠন করেছে সামরিক বাহিনীর বিরুদ্ধে লড়াইয়ের জন্য।
সোমবার এক বিবৃতিতে ফেডারেল ডেমোক্রেটিক ইউনিয়নের স্টিয়ারিং কাউন্সিল বলেছে, “আমাদের লক্ষ্য ও কৌশলগত উদ্দেশ্য হলো সামরিক স্বৈরতন্ত্রসহ সব ধরনের স্বৈরতন্ত্র সম্পূর্ণভাবে ভেঙে ফেলা এবং সম্মিলিতভাবে একটি নতুন রাজনৈতিক ব্যবস্থা গড়ে তোলা।”
বিশ্লেষকদের মতে, প্রতিরোধ গোষ্ঠীগুলো এখন আরো তীব্র সামরিক চাপের মুখে পড়তে পারে, পাশাপাশি প্রতিবেশী দেশগুলোর কাছ থেকেও বাড়তি নজরদারির শিকার হতে পারে। কারণ, তারা মিন অং হ্লাইংয়ের নতুন প্রশাসনের সঙ্গে সম্পর্ক জোরদার করার চেষ্টা করতে পারে।
Voice24 Admin 











