আইনের শাসনের নিজস্ব গতি রয়েছে। তবে আমাদের দেশে এত মামলা এবং মামলার এত জট যে এক জীবনে কোনো মামলার নিষ্পত্তি হতে চায় না। তাতে ঘটনার শিকার ক্ষতিগ্রস্ত ব্যক্তি বা তাঁর স্বজনদের ভোগান্তি ও ক্ষতি—উভয়ই বাড়তে থাকে। অপরাধীরও আইনের ভয়, আদালতের প্রতি সমীহ কমে যায়।
অপর দিকে ভুক্তভোগীদের আইন ও আদালতের প্রতি আস্থা কমতে থাকে। ফলে সমাজে ন্যায়বিচারের চেয়েও দ্রুত বিচারের প্রত্যাশা তৈরি হয়। আস্থা এতটাই কমেছে যে পাছে অপরাধী বেকসুর না হলেও হালকা শাস্তিতে পার পেয়ে যায়, তাই রাজপথে সম্ভাব্য সর্বোচ্চ শাস্তির দাবিই উঠতে থাকে।
বিভিন্ন সময়ে আমরা এমন দাবি উঠতে দেখেছি। সর্বস্তরের জনগণের চাপের সঙ্গে সুর মিলিয়ে রাজনৈতিক দল, গণমাধ্যম, এমনকি সরকারি মহলের পক্ষ থেকেও এ রকম দাবি জোরালোভাবে উঠতে দেখা যায়। আদালতের পক্ষে এমন সম্মিলিত চাপ অগ্রাহ্য করা মুশকিল হয়ে পড়ে। জনদাবির কাছে ন্যায়বিচার অনেক সময় নতি স্বীকার করে।
সম্প্রতি অতীতের একটি হত্যা মামলার দৃষ্টান্ত টেনে একজন বিচারক বলেছেন যে তখন গণমাধ্যম ও গণদাবির চাপ এতটাই প্রবল ছিল যে দ্রুত অপরাধীর সর্বোচ্চ শাস্তির দণ্ড দেওয়া হয় এবং তা কার্যকর হয়েছিল, কিন্তু সংশ্লিষ্ট ক্ষেত্রে সর্বোচ্চ শাস্তি ঠিক হয়নি।
উল্লেখ্য, আমরা কোনো অপরাধে লঘু শাস্তির পক্ষে ওকালতি করছি না, পল্লবীর শিশু ধর্ষণ ও হত্যার ক্ষেত্রে তো নয়ই। এমনকি দ্রুত বিচার ও শাস্তিরও ঢালাও বিরোধিতা করছি না। আমাদের বক্তব্য হচ্ছে, বিচারপ্রক্রিয়া যেন তার সব ধাপ সঠিকভাবে পূরণ করে এবং শাস্তি বা রায় যেন আইনের সবদিক বিবেচনার পরই ঘোষিত হয়। পরে যেন ভুল হওয়ার জন্য আফসোস ও অনুশোচনা করতে না হয়।
প্রায়ই পত্রিকায় বিনা বিচারে দীর্ঘ কারাবাসের খবর পাওয়া যায়। এমনিতেই কারাবাস একজন মানুষের সামাজিক সুনাম নষ্ট করে, এরপর দীর্ঘ অনুপস্থিতি তাঁকে অর্থনৈতিকভাবেও ক্ষতিগ্রস্ত করে, যেগুলো সংশোধনের বা পূরণের কোনো উপায় থাকে না।
আমরা জানি, এখানে মানুষ দাবি তুলে, মানববন্ধন বা সমাবেশ করে এ দেশের উদ্যান বাঁচিয়েছে, প্রাকৃতিক স্থানে বাণিজ্যিক হাসপাতাল নির্মাণের উদ্যোগ ঠেকিয়েছে এবং অপরাধীর উপযুক্ত শাস্তিও নিশ্চিত করেছে। কিন্তু কথা হলো, ছোটখাটো থেকে গুরুতর বিষয়গুলো যথাযথ দপ্তরের মাধ্যমে সঠিক আইন ও নিয়মের ভিত্তিতে সম্পন্ন হবে না কেন?
প্রশাসনিক কাজে দীর্ঘসূত্রতা এবং দুর্নীতির কারণে সঠিক কাজ যথাসময়ের মধ্যে হয় না। অর্থাৎ এখানেও রয়েছে মানুষের আস্থা হারানোর সংকট। এই প্রশাসন কখনোই ক্ষমতার পক্ষে কাজ করার ঔপনিবেশিক অভ্যাস ছাড়তে পারেনি। ক্ষমতার এই প্রাধান্য ও দাপট অব্যাহত থাকলে এবং ক্ষমতাসীনের এই দাপটকে কেউ আইন ও নীতির কারণে উপেক্ষার সাহস দেখালে যদি খেসারত দিতে বাধ্য হন, তাহলে প্রশাসন তো আপসকামী হবেই! আপস হবে ক্ষমতার সহযোগী ভাগীদার হয়ে, দুর্নীতি ও অপরাধে জড়িয়ে। তার চরম দৃষ্টান্ত এ দেশ বারবার দেখেছে।
এ রকম বাস্তবতায় নারী ও শিশু ধর্ষণ এবং ধর্ষণের পর হত্যার ঘটনায় সমাজ স্বাভাবিকভাবেই তার পুঞ্জীভূত ক্ষোভ উগরে দেবে। উদ্ভূত পরিস্থিতিতে এ রকম সর্বাত্মক জনপ্রতিক্রিয়ার চাপ সরকার ও সংশ্লিষ্ট সংস্থার পক্ষেও উপেক্ষা করা সম্ভব হয় না। তাতে ন্যায়বিচার ও ন্যায়সংগত সিদ্ধান্ত মিলতেও পারে, কিন্তু ভুলের আশঙ্কা বাড়ে।
তা ছাড়া এই প্রক্রিয়ায় যদি একটি সমাজ প্রতিকার আদায়ে সফল হতে থাকে, তাহলে আমাদের ভাবনা-বিশ্লেষণ অতি সরল হয়ে পড়ার শঙ্কা দেখা দেয়। পল্লবীর শিশুটির মামলায় নিম্ন আদালতে প্রদত্ত সর্বোচ্চ শাস্তির রায় যদি উচ্চ আদালতের মাধ্যমে দ্রুত বাস্তবায়িতও হয়, তাহলে কি সমাজ থেকে রাতারাতি ধর্ষণ, শিশু ধর্ষণ, হত্যা কমে যাবে? আলোচিত ঘটনাটির পরপরই আরও শিশু ও নারী ধর্ষণের ঘটনা ঘটেছে। সংবাদপত্রের খবর ও থানার তালিকার বাইরে এ রকম ঘটনা আরও ঘটে, এমনকি হত্যার ঘটনাও চাপা পড়ে যায়।
যেকোনো অপরাধের আইনি ব্যবস্থা ও শাস্তি অবশ্যই হতে হবে, কিন্তু তাতে এ ধরনের অপরাধের প্রতিকার হবে না। প্রতিকারের বা তা প্রশমনের ব্যবস্থার জন্য মনোযোগ দিতে হবে সমাজের গভীরে, প্রতিকার করতে হবে সেখানকার সংকটের।
ভাবা যায়, একটা দেশে গরিবের বিনোদনের প্রধান উৎস সিনেমা হল সম্পূর্ণ উঠে গেছে? সিনেপ্লেক্সে তো আমজনতা সিনেমা দেখতে পারবে না। সিনেমাকে শিল্প হিসেবে বাঁচাতে হলেও অবশ্যই আমমানুষের প্রেক্ষাগৃহ লাগবে, যেখানে তারা ৫০-১০০ টাকায় সিনেমা দেখবে, আবার তাতে তাদের মন প্রেমপ্রীতি, সুখ, বিরহ-বেদনার মতো মানবিক অনুভূতিতে প্রাণবন্ত থাকবে।
২.
আমাদের তরুণ নাগরিকেরা দেশের সম্পদ। কিন্তু সেই সম্পদের যথাযথ শারীরিক-মানসিক বিকাশ নিশ্চিত করার জন্য আমরা কী করছি? আমাদের শিক্ষা ঠিক নেই, স্কুল ঠিকভাবে তার ভূমিকা পালন করছে না, সমাজে শিশু থেকে তরুণ, যুবা থেকে বয়স্কজনের সুস্থ নির্মল বিনোদনের কোনো ব্যবস্থা নেই।
সরকার শিক্ষার সঙ্গে সাংস্কৃতিক কাজ যুক্ত করে এ ক্ষেত্রে পরিবর্তন আনতে চাইছে। একে আমরা স্বাগত জানাই। তবে অতীতেও সরকারি চেষ্টায় খুব বেশি ফল আসেনি। তার একটা কারণ সমাজমানসের পরিবর্তন। এদিকটা খেয়াল না করলে কেবল সরকারি প্রয়াস দিয়ে অভীষ্টমাত্রার সাফল্য আসবে না।
যেকোনো সমাজের মতো আমাদেরও সুস্থ বিনোদনের নিজস্ব বর্ণাঢ্য, সৃজনশীল, প্রাণবন্ত প্রক্রিয়া ও ধারা ছিল। কীভাবে এমন সমৃদ্ধ সংস্কৃতির চর্চা সমাজ থেকে ধীরে ধীরে প্রায় সম্পূর্ণ অবলুপ্ত হলো তা ভাবা দরকার। সুস্থ বিনোদন মানুষকে ইতিবাচক আবেগে তৃপ্তি দেয়। কী ছিল আমাদের এই সুস্থ আনন্দের খোরাক? এককালে গ্রামে গ্রামে যাত্রা হতো, নাটক হতো, পুঁথিপাঠের আসর বসত, মেলা হতো, তাতে সার্কাসসহ বিনোদনের নানা ব্যবস্থা থাকত, ছিল নৌকাবাইচ, ষাঁড়ের লড়াই। আর সুযোগ পেলেই ছিল হাডুডু-দাঁড়িয়াবান্ধার মতো সরঞ্জামহীন দেশি খেলা, পরে যুক্ত হয়েছিল ফুটবল ও ভলিবলের মতো আধুনিক খেলাও।
ভাবা যায়, একটা দেশে গরিবের বিনোদনের প্রধান উৎস সিনেমা হল সম্পূর্ণ উঠে গেছে? সিনেপ্লেক্সে তো আমজনতা সিনেমা দেখতে পারবে না। সিনেমাকে শিল্প হিসেবে বাঁচাতে হলেও অবশ্যই আমমানুষের প্রেক্ষাগৃহ লাগবে, যেখানে তারা ৫০-১০০ টাকায় সিনেমা দেখবে, আবার তাতে তাদের মন প্রেমপ্রীতি, সুখ, বিরহ-বেদনার মতো মানবিক অনুভূতিতে প্রাণবন্ত থাকবে। একসময় পাড়ার ক্লাব, অফিসার্স ক্লাব, গ্রামের সংঘ, পাঠাগার থেকে নাটক, বিচিত্রা, খেলাধুলা হতো নিয়মিত। কখনো তারাই সাংস্কৃতিক উৎসব, রবীন্দ্র-নজরুলজয়ন্তী, শিশুদের জন্য সাংস্কৃতিক প্রতিযোগিতা, খেলাধুলা ইত্যাদি আয়োজন করত। শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানেও এসব চর্চার চল ছিল। সরকারি প্রতিযোগিতামূলক আয়োজনের বাইরে বেশির ভাগ স্কুল-কলেজে সবই এখন বন্ধ।
আমরা জানি, সংস্কৃতিতে বরাবর গ্রহণ-বর্জনের প্রক্রিয়া চলতে থাকে, তার বদল-রূপান্তর ঘটে, নতুনে-পুরোনো বিতর্ক হয়। কিন্তু এসবের ভেতর দিয়েই তা চলতে থাকে, তাকে বন্ধ করলে সামাজিক প্রতিক্রিয়া হবে ভিন্ন। যে সমাজে সুস্থ সংস্কৃতির চর্চা অবরুদ্ধ, সেখানে মানুষ মনের ভাষা হারিয়ে দেহের ভাষার জবরদস্তিতে লিপ্ত হয়। এভাবে একটি সমাজ তার মনুষ্যত্ব হারায়। আমরা আজ সে রকম এক সংকটে, লজ্জাজনক পরিণতিতে এসে দাঁড়িয়েছি।
তাই আজ কেবল স্কুল-কলেজ, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানই নয়, সমাজকেই বরং সাংস্কৃতিকভাবে জাগাতে হবে। এ বিষয়ে সরকারকে প্রাথমিক উদ্যোগটি নিতে হবে, যাতে সমাজ কোনো রকম অন্যায় প্রতিবন্ধকতা ছাড়া শিল্প-সাহিত্য-সংস্কৃতির চর্চা করতে পারে। মনে রাখতে হবে, শরীর-মনের সুস্থতার জন্য শিশু থেকে বুড়ো—সবারই ইতিবাচক মনোভাব গড়ে তোলা ও ধরে রাখার জন্য আনন্দের খোরাক পেতে হবে। সরকার সবার জন্য সুরক্ষা দিলে বাকি কাজ সমাজ আপনিই করে নেবে। প্রকৃতির মতোই তারও আছে অনুকূল আবহে পুনরুজ্জীবিত হওয়ার, জীবনমুখী বিকাশের অন্তর্নিহিত শক্তি।
-
আবুল মোমেন কবি, প্রাবন্ধিক ও সাংবাদিক
মতামত লেখকের নিজস্ব
Voice24 Admin 

